Home কলাম ভ্যালেন্টাইন ডেঃ সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার নাম

ভ্যালেন্টাইন ডেঃ সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার নাম

2 min read
Comments Off on ভ্যালেন্টাইন ডেঃ সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার নাম
0
505

কলামঃ  ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস! নামটা মধুমাখা হলেও উদ্দেশ্য মিশানো রয়েছে চরিত্রবিনাশী ভয়াবহ বিষ। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উদযাপন পরিষদ ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে খৃস্টান দুনিয়া থেকে আমদানি শুরু হয়।গত কয়েক বছর ধরে অনেক মুসলিম দেশে এই দিবস পালনের রীতি চালু হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হোক বা না হোক দিবস পালনের নিষেধাজ্ঞা চোখে পড়ে না। বরং কিছু কিছু মিডিয়া এমনভাবে অনুষ্ঠান প্রচার ও লেখালেখি করে যাতে থাকে রগরগে যৌন সুড়সুড়ি যা অর্ধ-মৃত মানুষেরও মনেও জাগায় কামনার আগুন। আর এই অবাধ যৌনতাকে পুঁজি করে এ দিবস যেন অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে এটি এখন বিশেষ বিশেষ মহলে পালন করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক স্বার্থ ও মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশায় একটি ব্যবসায়িক মহল এবং হোটেল ব্যবসায়ীরা এর সাথে যুক্ত হয়ে এটি পালনকে উৎসাহিত করছে। “ক্লোজআপ” এর এই অবাধ যৌনতার উস্কে দিতে একধাপ এগিয়ে এই বছর ভ্যালেন্টাইন্সথডে উপলক্ষে দেশের শীর্ষ ৫ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে ০৯-১৬ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সকাল ৮.০০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য রিক্সা যুগে ফ্রি রিক্সা-ভ্রমনের কার্যক্রম ঘোষনা করেছে। যদিও ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের এই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে, এই জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। যারা চায় সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক তাদের সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন “নিশ্চয়ই যারা পছন্দ করে ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক তাদের জন্য ইহকালে রয়েছে লাঞ্ছনা ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সুরা নূরঃ ১৯] কিন্তু ভ্যালেন্টাইন ডে’র ইতিহাস ও ভিত্তি কী? এ সম্পর্কে অনেক মত আছে,আমি ইম্প্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রখ্যাত স্কলার ড. খালিদ বেগের একটি লেখার অংশ বিশেষ এখানে তুলে ধরলাম।‘‘আজকাল অনেক মুসলিমই প্রকৃত বিষয়টি না জেনে নানা রকম বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা করে থাকে। তারা কেবল তাদের সাংস্কৃতিক নেতাদের মতোই এসব ক্ষেত্রে অন্ধ অনুসারী। তারা এটি খুবই কম উপলব্ধি করে যে, তারা যা নির্দোষ বিনোদন হিসেবে করে তার শিকড় আসলে পৌত্তলিকতায়, যা তারা লালন করে তা হলো অবিশ্বাসেরই প্রতীক। তারা যে ধারণা লালন করে তা কুসংস্কার থেকেই জন্ম। এমনকি ইসলাম যা পোষণ করে এসব তার প্রত্যাখ্যান। ভালোবাসা দিবস আমেরিকা ও ব্রিটেন বাদে গোটা ইউরোপে মৃত হলেও হঠাৎ করেই তা মুসলিম দেশগুলোয় আবার প্রবেশ করছে। কিন্তু কার ভালোবাসা? কেন এ দিবস পালিত হবে? অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে তারা যেমন করে, এ বিষয়েও কথিত আছে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে উর্বরতা ও পশুর দেবতা বলে খ্যাত লুপারকাসের (খঁঢ়বৎপঁং) সম্মানে পৌত্তলিক রীতিনীতির একটি অংশ হিসেবে রোমানরা ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন শুরু করে। এর মূল আকর্ষণ হলো পরবর্তী বছরের লটারির আগ পর্যন্ত বর্তমান বছরে লটারির মাধ্যমে যুবকদের মাঝে যুবতীদের বণ্টন করে দেয়া। এ দিন উদযাপনে অন্যান্য ঘৃণ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি ছিল, এক টুকরো ছাগলের চামড়ায় আবৃত যুবতীদের দু’জন যুবক কর্তৃক উৎসর্গকৃত ছাগল ও কুকুরের রক্তে ভেজা চাবুক দিয়ে প্রহার করা। মনে করা হতো ‘পবিত্র যুবক’দের প্রতিটি ‘পবিত্র’ আঘাত দ্বারা ওই সব যুবতী ভালোভাবে সন্তান ধারণে সক্ষম হবে। খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যথারীতি লুপারকালিয়ার (খঁঢ়বৎপধষরধ) এ ঘৃণ্য রীতিকে বন্ধ করার বৃথা চেষ্টা করল। প্রথমে তারা মেয়েদের নামে লটারির বদলে ধর্মযাজকদের নামে লটারির ব্যবস্থা চালু করল। এর উদ্দেশ্য হলো, যে যুবকের নাম লটারিতে উঠবে সে যেন পরবর্তী একটি বছর যাজকের মতো পবিত্র হতে পারে। কিন্তু খ্রিষ্টানরা খুব কম স্থানেই এ কাজে সফল হলো। একটি জনপ্রিয় খারাপ কাজকে কিছু পরিবর্তন করে তাকে ভালো কাজে লাগানোর প্রবণতা বহু পুরনো। তাই খ্রিষ্টানরা শুধু লুপারকালিয়া থেকে এ উৎসবের নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন করতে পারল। পোপ গ্যালাসিয়াস (এবষষধংরঁং) ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের সম্মানে এটি করল। কিন্তু কিছু মারাত্মক অসুবিধার জন্য ফ্রান্স সরকার উল্লিখিত লটারি ১৭৭৬ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কাল পরিক্রমায় এটি ইতালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানি থেকেও উঠে যায়। এর আগে সপ্তদশ শতাব্দীতে পিউরিটানরা যখন শক্তিশালী ছিল সে সময় ইংল্যান্ডে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু রাজা দ্বিতীয় চার্লস এটি ১৬৬০ সালে পুনরুজ্জীবিত করেন। ইংল্যান্ড থেকেই এটি নতুন বিশ্বে আগমন করে যেখানে এটিকেই টাকা বানানোর ভালো মাধ্যম হিসেবে নিতে ইয়াংকিরা (আমেরিকানরা) উদ্যোগী হয়। ১৮৪০ সালের দিকে ইস্টার এ হল্যান্ড ‘হোয়াট এলস ভ্যালেন্টাইন’ (ডযধঃ বষংব ঠধষবহঃরহব) নামে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আমেরিকান ভ্যালেন্টাইন ডে কার্ড বানায় এবং প্রথম বছরই ৫০০০ ডলারের কার্ড বিক্রি হয় (তখন ৫০০০ ডলার অনেক)। সে থেকে ভ্যালেন্টাইন ডে ফুলে ফেঁপে ওঠে। খ্রিষ্টানরা এর নাম পরিবর্তন করে ঠিকই, কিন্তু পৌত্তলিক শিকড় পরিবর্তন করতে পারেনি। কী করে একজন সচেতন মানুষ ভাবতে পারে ইসলাম অনৈসলামিক ধারণা এবং বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত অযৌক্তিক আচার অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে?ৃএটি একটি বিশাল ট্র্যাজেডি যে মিডিয়ার মাধ্যমে নিত্য বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অপপ্রচারে মুসলমানেরা ভালোবাসা দিবস (ঠধষবহঃরহব ফধু) হেলোইন (ঐধষষড়বিবহ) এবং এমনকি সান্তাক্লজকেও (ঝধহঃ পষধঁং) আলিঙ্গন করে নেয়।’’ (ইম্প্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল, লন্ডন, মার্চ ২০০১)। এটিই ভ্যালেন্টাইন দিবসের ইতিহাস।
আজকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি এলেই এক শ্রেণীর প্রেমিক-প্রেমিকারা দু’জন দু’জনকে একান্তে পাওয়ার ইচ্ছায় নানা কিছু করে। কার্ড, ফুল, চকলেট, লটারি, বিনোদন, ডেটিং, অশ্লীল বৈশিষ্ট্যের পার্টিতে যোগদান, নানা কিছু উপহার দেয়া, মন বিনিময়, মত বিনিময় ও অবাধ যৌনাচার এ দিবসের মূল লক্ষ্য। উপহারকে যে যত বেশি আকর্ষণীয় করতে পারে তার ভালোবাসা যেন ততই পূর্ণতা লাভ করে। কেউবা তার প্রেমিকাকে এভাবে বলে, পৃথিবীর সকল উপহারই তোমার কাছে তুচ্ছ। তাই তোমার জন্য আমি নিজেই জীবন্ত উপহারের উপকরণ। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করতে পার। এমন কথা শুনলে একজন প্রকৃত মানুষের বাকশক্তি না হারিয়ে পারে না। কীভাবে মানুষ অবৈধভাবে এমন কার্যে জড়াতে পারে?এ রকম একটি পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারভিত্তিক অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে জনগণের শতকরা ৯০ জন মুসলমান সেখানে কিভাবে পালিত হতে পারে? ইসলাম আমাদের প্রকৃত ও অকৃত্রিম ভালোবাসাই শিক্ষা দেয়, যা এ ধরনের অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। ভালোবাসা বললেই যেন বৈধ কথাটা হারিয়ে যায়, কিন্তু কেন? ইসলাম ভালোবাসার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে কিন্তু অবৈধ ভালোবাসাকে কখনো অনুমোদন করেনি। ইসলামে ভালোবাসার রূপরেখার মধ্যে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাপন পদ্ধতি। ইসলামী শরীয়তের যথাযথ অনুসরণ, হালাল-হারামের সীমারেখা, শালীন পোশাক-পরিচ্ছেদ, আত্মিক ও দৈহিক সৌন্দর্যবোধ, সুস্থ বিনোদনমূলক কর্মকা- পরিচালিত বিষয়াবলী। ভালোবাসাই হলো ইসলাম। ভালোবাসাই শান্তি ও সম্মান। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেন, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং সমস্ত মানুষের তুলনায় অধিক প্রিয় না হই।’ (বোখারি ও মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে আমার আদর্শকে ভালোবাসলো সে আমাকে ভালোবাসলো। আর যে আমাকে ভালোবাসলো সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি)। একজন মানুষের ভালোবাসা শুরুই হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার মাধ্যমে। সেটাই হবে প্রকৃত ভালোবাসা। পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য অধিক পরিমাণে সালামের প্রচলন করা প্রয়োজন। ভালোবাসার দ্বারা এক ব্যক্তি যদি অন্যের প্রতি আসক্ত হয় তাকে বলে বন্ধু। হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘যার বন্ধু নেই সে গরিব।’ হজরত আবুবকর (রা.) বলেন, ‘সর্বাপেক্ষা দুর্বল ব্যক্তি সে, যার কোনো বন্ধু নেই।’ কিন্তু ভালোবাসার বন্ধু কে হবেন সে সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু সাইদ (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানদার ব্যতীত কাউকেও সাথী বানিও না।’ (তিরমিজি, আবুদাউদ, মিশকাত)। অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে গড়ে ওঠে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য রাখা উচিত সে কাকে বন্ধু করে নিচ্ছে।’ (আহমদ, তিরমিজি, আবুদাউদ)।কিন্তু আজকের সমাজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের নামে যে মাতামাতি করছে তা বিজাতীয় সংস্কৃতি। অধিকাংশ মুসলমান অজ্ঞতাবশত অন্ধভাবে অনুকরণ করছে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করল সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য।’ ভালোবাসা দিবস পালন করাও এ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এটি খ্রিস্টানদের উৎসব। যে মুসলমান আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার জন্য এ দিবস পালন মোটেই বৈধ নয়।আমাদের দেশে এটি বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশা এবং ব্যাভিচারের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালবাসা দিবস নামক বিজাতীয় সংস্কৃতি তরুণ-তরুণীদের গ্রাস করেছে, তাদের সুকুমার বৃত্তিকে করছে কলুষিত। নিজেদের পরিচয় ভূলে বিদেশী সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে হারিয়ে ফেলতে বসেছে নিজেদের স্বকীয়তা। এটি মুসলমানদের এবং বাংলাদেশীদের সংস্কৃতির অংশ নয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এমন কোনো অংশই, যা অশ্লীল এবং অশালীন, আমাদের দেশে অনুমোদন করা উচিত নয়। এ সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও সবাইকে সতর্ক করা সস্থ্য সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
এ অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে সমাজ সচেতন প্রত্যেক ব্যাক্তিবর্গকে স্ব স্ব ক্ষেত্র থেকে যথাযত ভুমিকা রাখতে হবে। আগামী প্রজন্মকে নিরাপদ রখতে নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে বেমানান এই ভ্যালেন্টাইন ডে এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যতায় ভুলের মাসুল দিতে হবে পুরো জাতিকেই।

লেখকঃ এহতেশামুল আলম জাকারিয়া , সাবেক ছাত্রনেতা ও সমাজকর্মী ।

Load More Related Articles
Load More In কলাম

Check Also

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে যা বললেন ড. ইউনূস

 এক দুই সহপাঠীর অপঘাত মৃত্যুর প্রতিবাদে স্কুলের শিশুকিশোররা রাস্তায় নেমেছে। রাস্তায় তারা শ…